সম্ভাবনাময় সৌর বিদ্যুতের বড় হাতছানি বাধাগ্রস্ত করছে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি!

Posted by
google news

ঘর বাড়িতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের চিন্তা করা যেতে পারে।

সৌর বিদ্যুৎবাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে সূর্যরশ্মির আলো ও তাপ থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের।

এই বিদ্যুতের ব্যবহার দেশে শুরু হয়েছে গেল কয়েক বছর আগে। বর্তমানে অনেক বাড়ির ছাদে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্যানেল দেখতে পাওয়া যায়।

এক সময় নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সৌর প্যানেল স্থাপনের বাধ্যবাধকতাও করা হয়েছিল। তবে সেই তোড়জোড় এখন আর তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় না।

নানা টালবাহানায় হয়তো সেই মহৎ উদ্যোগটি অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে গেছে।

অনেকের মতে উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হওয়া সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

তবে, সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার মানুষের মধ্যে আশানুরূপ আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি, সঠিক ধারণা না থাকার পাশাপাশি প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হওয়ার কারণে।

অন্যদিকে, সোলার মার্কেটের জালিয়াতির কারণে নবায়নযোগ্য এই বিদ্যু শক্তির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সোলার মার্কেটের জালিয়াতি

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সূর্যরশ্মির আলো ও তাপকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আর এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় সোলার প্যানেল অসংখ্য ফটোভোল্টাইক সেলের সমষ্টি, যা সূর্যের আলোকশক্তিকে ব্যবহার উপযোগী বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় লক্ষাধিক সোলার হোম সিস্টেম বিক্রি হচ্ছে।

তবে, সৌর বিদ্যুৎকে ঘিরে দেশে ক্রমেই সম্ভাবনা তৈরি হলেও, সোলার প্যানেল বিক্রেতারা এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহীদের বিভিন্ন ভাবে ঠকিয়ে যাচ্ছেন।

সাধারণ ক্রেতা জালিয়াতি ধরতে পারেন না। আর এই সুযোগ নিচ্ছে সোলার প্যানেল বিক্রেতারা।

ঢাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমানের বরাবরের ইচ্ছা ছিল নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করবেন।

দিনের বেলায় একটি বা দুটি ছোট ডিসি (ডাইরেক্ট কারেন্ট) ফ্যান চালানোর জন্য একটি ছোট সোলার প্যানেল ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি।

দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে লোডশেডিং ফিরে এলে আরিফ প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করেন।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বাড়ির কিছু নিয়মিত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে ছাদে সোলার প্যানেল চালানোর সিস্টেম স্থাপন করবেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুদিন ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করার পর আরিফ নবাবপুরে শ্যানজগ পাওয়ার প্যাক নামে একটি দোকান খুঁজে পান।

সেখান থেকে সোলার প্যানেলের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনেন।

শেষ পর্যন্ত সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে দেখে আরিফ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।

কিন্তু তার উৎসাহ মিইয়ে যেতে সময় লাগল না। সিস্টেম স্থাপনের দুদিন পর দেখা গেল সিস্টেমটি আরিফের বাড়ির বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ করছে না।

পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করার পর দেখা গেল চার্জ কন্ট্রোলারটি আসলে পিডব্লিউএম, কিন্তু লেবেল সাঁটা হয়েছে এমপিপিটি হিসাবে।

এটি ১২ ভোল্ট ব্যাটারির ভোল্টেজকে কমিয়ে চার্জিং ভোল্টেজে নামিয়ে আনে, কিন্তু বিদ্যুৎ প্রবাহ বাড়ায় না, অথচ এটাই এ ধরনের ডিভাইসের অন্যতম প্রধান কাজ।

ফলে ইনভার্টারটি ছাদের সোলার প্যানেল থেকে সরবরাহ করা শক্তির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পাচ্ছিল।

এছাড়াও  ট্রান্সমিশন ক্যাবলগুলো আসলে চেয়ে অনেক পাতলা ছিল। মাত্র সাড়ে ৭ অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুতেই গরম হয়ে যাচ্ছিল।

শুধু আরিফই নন, আরও অনেকে সোলার বাজারের বিক্রেতাদের কাছে প্রতারিত হয়েছেন। ক্রেতাদের ঠকানোর জন্য এমপিপিটিসহ চার্জ কন্ট্রোলারসহ আরও অনেক আইটেমেই ভুল লেবেল সাঁটানো হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য

নাম না প্রকাশের অনুরোধ শর্তে এক ব্যবসায়ী জানান, ‘অনেক সরবরাহকারী প্রকৃত পাওয়ার রেটিংয়ের চেয়ে বেশি ওয়াটেজ দেখানোর জন্য সৌর প্যানেলগুলোকে রি-লেবেল করে।

এটি করলে প্রতি ওয়াটের জন্য কম দাম চাইতে পারে; এতে করে আমরা বাজারে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা হারাচ্ছি। পাশের দোকানেই সস্তা প্যানেল পাওয়া যাওয়ায় আমাদের দোকান থেকে কেউ কেনে না।’

ওই বিক্রেতা আরও বলেন, ‘সাধারণ ক্রেতা এই জালিয়াতি ধরতে পারেন না। তাই তারা আপাতদৃষ্টিতে সস্তা সোলার প্যানেল কেনেন, যদিও তারা আসলে অনেক বেশি দামেই জিনিসটা কিনছেন।’

এসব ঘটনা নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি আগে দেশের শহরাঞ্চলে সোলার মার্কেট সম্প্রসারিত হতে শুরু হওয়ার সময় থেকেই বিপণন জালিয়াতিরও জন্ম।

এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন থাকলেও নজরদারির অভাবে এসব অসাধু কর্মকাণ্ড চলছে লাগামহীনভাবে।

পাঁচ কারণে নষ্ট হচ্ছে সৌর প্যানেল

পাঁচ কারণে সৌর প্যানেল নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

এই কারণগুলো হলো-

  • নিম্নমানের সৌর প্যানেল ব্যবহার।
  • নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা।
  • ইনভার্টার সঠিকভাবে কাজ না করা।
  • ব্যাটারি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা ও ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার পর তা পরিবর্তন না করা।

এসব ত্রুটির কারণে গ্রাহকের আঙ্গিনায় বসানো এক লাখ ৪৮ হাজার সৌর প্যানেলের মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি নষ্ট হয়ে গেছে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

জানা গেছে, সাধারণত একটি সৌর প্যানেল ২০ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু নিম্নমানের প্যানেল বসানোর কারণে সেগুলো মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়।

বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযোগ—গ্রাহকরা যতটা সংযোগ পেতে আগ্রহী, প্যানেল রক্ষণাবেক্ষণে ততটা আগ্রহী নন। ফলে প্যানেল বসানোর কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো নষ্ট হতে শুরু করে।

সৌর প্যানেল নষ্ট হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, আমরা সরেজমিনে মনিটরিং করে বেশ কয়েকটি কারণ পেয়েছি। এরমধ্যে নিম্নমানের সৌর প্যানেল ব্যবহার সবচেয়ে বড় সমস্যা।

গ্রাহকরা অনেক সময় সংযোগ নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে সস্তা-নিম্নমানের প্যানেল কেনেন।

এ প্যানেলগুলো কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেকে ভালো মানের কিনলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করেন না। এতে প্যানেল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমনটা জানান, বিকাশ দেওয়ান।

তার মতে, প্যানেল কিনলেও অনেকের ইনভার্টার সঠিকভাবে কাজ করে না। কাজ করছে কিনা, তাও পরীক্ষা করেন না তারা। এতেও প্যানেল সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।

অন্যদিকে প্যানেলের একটি দরকারি যন্ত্র হচ্ছে ব্যাটারি। সেই ব্যাটারি অনেক সময় অবহেলার কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ফলে নষ্ট হয়ে যায়। পরে গ্রাহকরা আর নতুন করে ব্যাটারি কিনতে চান না। এসব কারণেই সৌর প্যানেলের ব্যবহার কমে যাচ্ছে।

সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে নানা ভাবনা

বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর হলো।

সৌর বিদ্যুৎ উৎপন্ন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে পরিবেশ বান্ধব; এ প্রক্রিয়াটি পরিবেশকে দূষিত করে না।

বলতে গেলে এই বিদ্যুৎ উৎপন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই।

স্বল্প খরচে অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবহার ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এ বিদ্যুৎ বিরাট পরিবর্তন এনে দেবে- এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আর তা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ধারাকে করবে আরো গতিশীল এবং শক্তিশালী।

এ কথা সত্যি, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সুবিধা বঞ্চিত এলাকায়, বিশেষ করে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছোটবড় চরাঞ্চলে, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন।

তাই ঐসব এলাকায় সৌর বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া যেতে পারে।

এছাড়াও, দেশে অসংখ্য ইঞ্জিন চালিত নৌযান রয়েছে। কোনোটিতে যাত্রী বহন করে, আবার কোনোটিতে বিভিন্ন মালামাল।

সম্ভবত ঐ যানগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা কেরোসিন ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

আমদানি করা ঐ জালানির পরিবর্তে যদি প্রতিটি নৌযানের ওপরের ছাদে (নিরাপদ ব্যবস্থায়) সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুত উৎপন্ন করা যায় তাহলে অন্তত কিছুটা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে আগেরদিনের মতো এখন আর তেমন বনজঙ্গল নেই। গ্রাম-গঞ্জে গাছের বেশির ভাগ কাঠই ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে।

তাই গ্রামাঞ্চলে রান্নার কাজে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে অনেক গাছপালাই আমাদের হাত থেকে বেঁচে যেতো।

পরিবেশ ও প্রকৃতি তার নিজের অবস্থান ফিরে পেতো। শুধু প্রয়োজন আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে সৌর বিদ্যুত ব্যবহার করার জন্য উপযুক্ত চুলা নির্মাণ করা। এ ব্যাপারটিও আমরা ভেবে দেখতে পারি।

সৌর বিদ্যুৎতে প্রচুর সম্ভাবনা দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক।

ভবনের ছাদেও প্রচুর পরিমাণে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

দেশের বিদ্যুতের চাহিদা কতটা মেটাতে পারবে সৌর বিদ্যুৎ?

পটুয়াখালীর বাসিন্দা নুরুন্নাহার আক্তার। তিন ছেলেমেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে তাঁর পাঁচজনের পরিবারে সব ধরনের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ হচ্ছে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে।

তিনি বলছিলেন, গ্রামাঞ্চলে সরকারিভাবে সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ বেশিরভাগ সময় থাকেনা বললেই চলে। কারেন্টের চেয়ে অনেক সুবিধা পাইতেছি সোলার পাওয়ারে। কারেন্টে মাসে মাসে বিল দিতে হয়। কিন্তু এটা তো একবারে কেনা যায়। তারপর অনেক দিন থাকে”।

নুরুন্নাহার আক্তার বলছিলেন বাড়িতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ-এর সংযোগ থাকা সত্ত্বেও তা তিনি ব্যবহার করেন না।

২০০৭ সালে প্রথম সৌর বিদ্যুতের একটি প্যানেল কিনেছিলেন। বাড়ির চালে বসানো সৌর বিদ্যুতের প্যানেল থেকে এখন তার বাড়িতে পাঁচটি বাতি ও একটি ফ্যান চলে।

সরকারের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে ৬০ লাখের বেশি গৃহস্থালিতে ইতিমধ্যেই সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে।

আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো উৎস সৌরশক্তি

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সৌরশক্তিই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সবচেয়ে ভালো উৎস। হাঁটি হাঁটি পা পা করে দেশে অনেকটাই এগিয়েছে সৌরবিদ্যুৎ।

প্রথম দিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ছিল ব্যাটারিভিত্তিক ছোট ছোট সোলার হোম সিস্টেম, যা সন্ধ্যার পর দু-চারটি লাইট আর ফ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

২০০৮ সালে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি গ্রহণ করে।

স্থির হয়, ২০১৫ সাল নাগাদ আমাদের শক্তিচাহিদার ৫ শতাংশ এবং ২০২০ সাল নাগাদ ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য খাত থেকে আসবে।

সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি মূলত অর্থনৈতিক কারণে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির দাম তুলনামূলক অনেক বেশি।

আমাদের সৌরশক্তির প্রাপ্যতা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম অঞ্চলে। যত বিষুবরেখার দিকে যাবেন সূর্যের কিরণ তত খাড়াভাবে পড়বে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অনেকটা জায়গা লাগে।

এই কাজে কৃষিজমি ব্যবহার না করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যেমনটা রয়েছে কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রেও।

আমাদের দেশে পতিত বা অনাবাদি জমি তুলনামূলক উত্তরাঞ্চল, নদীর তীরবর্তী চর ও সাগরের মোহনা এলাকায় বেশি।

তাই এসব অঞ্চলে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা হচ্ছে। নেট মেটারিংয়ের আওতায় বাংলাদেশে রুফটপ সৌরবিদ্যুতেরও একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশে সৌরশক্তির বিষয়টি এগিয়ে নিতে সোলার এনার্জি রোডম্যাপের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

এটি এখন বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনাধীন। ২০১৭ সালের আগস্টে দেশে প্রথম জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়। সেটা ছিল সৌরশক্তির বিকাশে এক উজ্জ্বল মাইলফলক।

পরিবেশ সংরক্ষণের তাগিদে জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলকভাবেই কমে আসবে আগামী দিনে। প্রস্তুতি নিতে হবে বিকল্প জ্বালানির।

আমরা চাই বা না চাই, বিশ্বের ভবিষ্যৎ যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক হবে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। যারা আগে শুরু করবে তারা এগিয়ে থাকবে।

আমাদের সোলার প্যানেল, সেল, ব্যাটারি বা অন্য কোনো যন্ত্র উপকরণ উদ্ভাবন নিয়ে মৌলিক গবেষণার সুযোগ সীমিত।

আমাদের চাই প্রয়োগিক গবেষণা। আমাদের হাতে যা আছে তা কিভাবে আরো দক্ষতার সঙ্গে, স্বল্প খরচে আমাদের দেশের জন্য কাজে লাগানো যায় তা দেখতে হবে।

জাতীয় সোলার হেল্প ডেস্ক চালু

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) উদ্যোগে ছাদে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন সেবা দিতে চালু হলো জাতীয় সোলার হেল্প ডেস্ক।

নেট মিটারিংয়ের অধীনে রুফটপ সোলার প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে এই হেল্প ডেস্ক।

যেকোনও আগ্রহী ব্যক্তি আবেদনের শর্তাবলী, আবেদন প্রক্রিয়া, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং রুফটপ সোলার সিস্টেমের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য স্রেডার ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারবেন।

এছাড়াও ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাধ্যমে অথবা আইইবি বিল্ডিং, রমনায় অবস্থিত স্রেডা অফিসে সরাসরি উপস্থিত হয়ে আগ্রহী গ্রাহক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

সৌর বিদ্যুতের বিলবোর্ডে ব্যবহার করবে নগদ

বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে সৌরশক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে দেশের অন্যতম প্রধান মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ।

সম্প্রতি কোম্পানির প্রচারের জন্যে স্থাপিত বিলবোর্ডগুলো পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নগদ।

বুধবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে নগদ এর সব বিলবোর্ডে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে বিলবোর্ড পরিচালিত হবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া শক্তি দিয়ে।

সেচ পাম্পে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বদলে দিচ্ছে

সেচ পাম্পে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বদলে দিতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চিত্র।

সারাদেশে সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় ২ হাজার ৪শ মেগাওয়াটে। অন্যদিকে সেচের জন্য ডিজেলের চাহিদা রয়েছে ১৩ লাখ ৪০ হাজার মে.টন।

পাম্পগুলো সৌর বিদ্যুতে চালালে জ্বালানির এ চাহিদা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের নির্দেশনা হচ্ছে-সেচ মৌসুমে রাত ১১ টার পর থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত অফপিক সময়ে সেচ পাম্প চালাতে হবে। প্রতিদিন ৭ ঘণ্টা চলবে একটি পাম্প। সৌর বিদ্যুতে গড়ে একটি পাম্প ৫ ঘণ্টা পানি তুলতে পারে।

বাকি সময়ে কী হবে,এ প্রশ্নে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিদ্যুতে চলা সেচ পাম্পের তুলনায় দ্বিগুণ ক্ষমতার সৌর সেচ পাম্প বসাতে হবে। তবেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ব-দ্বীপে অবস্থিত হওয়ায় কৃষিতে সেচ বেশ জরুরি। কৃষির খরচের ৪৩ ভাগই সেচের পেছনে হয়।’

বিদ্যুত বিভাগের সেচ পুস্তিকা-২০২১ এ বলা হয়,সারাদেশে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৬০৭টি। গেল বছর যা ছিল ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৮১টি।

সারাদেশে এ পাম্প চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় ২ হাজার ৪১১ মেগাওয়াট। আবার সেচ মৌসুম মানেই (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) গ্রীষ্মকাল।

এজন্য সেচে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে গরমে চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে সরকার হিমশিম খায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন পাম্পগুলো যদি একেবারেই গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ না নেয় তবে চাপ কমবে।

দেশে প্রায় ১০.৩৪ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প ৩৪ লাখ হেক্টর জমিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পাম্পে সোলার প্যানেল বসালে এতো ডিজেলের প্রয়োজন হবে না বলে মনে করছে স্রেডার কর্মকর্তারা।

এতো এতো আশাব্যাঞ্জক খবরের পরও দেখা গেলো দেশে সৌরচালিত সেচ পাম্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। ধারণা করা হচ্ছে এর সংখ্যা কয়েক হাজার। সরকারের উদ্যোগের বাইরেও অনেকে সোলার পাম্প বসিয়েছে।

স্রেডা বলছে, এখন যে সোলার ইরিগেশন সিস্টেমগুলো আছে, সেগুলো বছরের অর্ধেকের বেশি সময় অব্যবহৃত থাকে।

আর তাই সোলার ইরিগেশন সিস্টেমের গ্রিড ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত সোলার সিস্টেমের যথাযথ ব্যবহার হলে তা সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।

কম খরচে সৌর বিদ্যুতের একক মডিউল বানালেন খুবি শিক্ষক

কম খরচে সৌর বিদ্যুতের একক মডিউল উৎপাদনে সফল হয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পদার্থ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক মো. সালাহউদ্দীন মিনা।

গবেষণাটি কোরিয়ান সরকারের মেধাস্বত্ব (পেটেন্ট) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গবেষণায় তার এ সাফল্য আগামী দিনে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

গবেষণাটি দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জুমহো কিনের তত্ত্বাবধানে করা হয়েছে। এটি ন্যানো ফটো ইলেক্ট্রনিকস ডিভাইসেস ল্যাবে করা হয়।

গবেষক সালাহউদ্দীন বলেন, সৌর বিদ্যুতের একক মডিউল বা সৌর প্যানেল হলো অনেকগুলো একক কোষের সন্নিবেশ। কোষগুলো সূর্যের আলো সরাসরি শোষণ করে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে যা পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব একটি প্রক্রিয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, খার উপাদান মিশ্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে উচ্চমানের আলো শোষণকারী পাতলা ফিল্মের (সোলার সেল) উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করে খুব কম খরচে পানির দ্রবণের মাধ্যমে সৌর বিদ্যুতের একক মডিউল উৎপাদন সম্ভব।

এই উদ্ভাবনের ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সহজ হবে। একই সঙ্গে সৌর কোষ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও সাশ্রয়ী হবে।

সহকারী অধ্যাপক সালাহউদ্দীন ২০১৮ সালের আগস্ট মাস থেকে উচ্চতর শিক্ষা (পিএইচডি) গ্রহণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে কো-অথর হিসেবে তার ৫টি গবেষণা প্রবন্ধ হাই ইমপ্যাক্ট, এসসিআই জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

সৌর প্রযুক্তি যাত্রা শুরু

সৌর প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল ১৮৬০ –এর দশকে।

১৮৮৪ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের একটি বাড়ির ছাদে সর্বপ্রথম সৌর বিদ্যুৎ তৈরি করা হলেও এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং প্রসারণ আর ঘটেনি।

যাহোক, বিংশ শতাব্দিতে এসে মানুষ আবার সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে, ১৯৭৪ সালে উত্তর আমেরিকার ৬টি বাড়িতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়।

১৯৭৯ সালে সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট শুরু হলে জ্বালানি নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

এ প্রেক্ষিতে উন্নত বিশ্ব সৌর প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপ করে।

তবে ১৯৮০ –এর দশকে জ্বালানি তেলের দাম আবার হ্রাস পেতে শুরু করলে ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল অবধি সৌর বিদ্যুৎ উৎপন্ন অনেকটা স্লথ গতিতে চলতে থাকে।

পরবর্তীতে আবার সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন এবং ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৬ সাল নাগাদ বিশ্বে উল্লেখযোগ্য পরিমান সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। আর সবচেয়ে বেশি হচ্ছে চীনে।

একইসাথে ঘনীভূত সৌর বিদ্যুৎ (সিএসপি) উৎপাদনও দ্রুত গতিতে প্রসার লাভ করছে।

২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২৭% সৌর বিদ্যুৎ থেকে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন…

মতামত দিন